ঢাকা   রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রেডিও বার্তা
রেডিও বার্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
খুঁজছি: বিভাগীয় প্রধান

দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক যেন ‘মৃত্যুর করিডোর’

Authorস্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২৩ পিএম

দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক যেন ‘মৃত্যুর করিডোর’

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যিক, পর্যটন ও ত্রাণ কার্যক্রমের প্রধান সড়ক চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক এখন মৃত্যুর অন্য নাম। দুই লেনের এই মহাসড়ক গত এক দশক ধরে দুর্ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও চার বা ছয় লেনে উন্নীত করার সরকারি পরিকল্পনা এখনো ফাইলবন্দী। চলতি বছরের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত এই সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৪ জন; আহত হয়েছেন ১৩২ জন। গত পাঁচ বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়েছে। মহাসড়কের বর্তমান অবস্থা শুধু সড়ক নয়, বরং পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থাকেও বিপন্ন করে তুলেছে।

মহাসড়কটিতে প্রতিদিন চলাচল করে প্রায় ৩০–৩৫ হাজার যানবাহন, অথচ এটির ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ১২–১৫ হাজার। ফলে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিকভাবে দ্বিগুণের বেশি। লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, পটিয়া, চকরিয়া ও রামু অংশগুলোতে যানবাহনের গতি ওভারটেকিংয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। সওজ ইতোমধ্যে ২১টি স্থানকে ‘হাই রিস্ক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কটি মূলত ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত হয়, তখন যানবাহনের চাপ ছিল বর্তমানের এক-চতুর্থাংশ। উন্নয়ন বাড়লেও সড়ক উন্নীত হয়নি—ফলে আজ এটি হয়ে উঠেছে মৃত্যুর ফাঁদ।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৮২টি বড় দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, ছোট দুর্ঘটনাগুলো যোগ করলে সংখ্যা ২০০–এর কাছাকাছি। ৫ নভেম্বর চকরিয়ায় সংঘটিত দুর্ঘটনায় এক পরিবারের ৫ জন নিহতের ঘটনায় জড়িত মারসা পরিবহনের গাড়িটির রোড পারমিট দুই মাস আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল—যা সড়ক নিরাপত্তায় পরিদর্শন ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকেই প্রমাণ করে।

এ অবস্থায় স্থানীয়দের আন্দোলন নতুন নয়। গত তিন বছরে লোহাগাড়ায় ১১ বার, চকরিয়ায় ৮ বার, কক্সবাজারে ৭ বার এবং রামুতে ৫ বার রাস্তা অবরোধ, মানববন্ধন ও গণসমাবেশ হয়েছে। সবাই এক দাবিতে ঐক্যবদ্ধ—“ছয় লেন ছাড়া বিকল্প নেই।” বুধবার চকরিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামের চেরাগি পাহাড়েও জনতা আবারও সড়কে নামে। বক্তারা বলেন, “এই সড়কে প্রতিটি দিন মানে অনিশ্চিত মৃত্যু।”

এর মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে বেলার লিগ্যাল নোটিশ। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট (ফেজ–২) প্রকল্প বাতিল বা স্থগিতের দাবি জানিয়ে তারা ১৩টি সরকারি দপ্তরে নোটিশ পাঠায়। তাদের যুক্তি—চুনতি অভয়ারণ্য, ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্য ও মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চুনতি অভয়ারণ্য বাংলাদেশের একমাত্র এশীয় বন্যহাতির প্রধান করিডোর। প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর এই অভয়ারণ্য, ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। কক্সবাজারের মেধাকচ্ছপিয়ার ৩৯৬ হেক্টর এবং ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্যের ১৩০৩ হেক্টর জমির একটি অংশ সড়কের পাশ ঘেঁষে তৈরি।

বন বিভাগ দাবি করছে, সড়ক সম্প্রসারণ করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বনভূমি হারিয়ে যাবে, যার ফলে হাতির চলাচল, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থান ও প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম সোজাসাপ্টা বলেন, “সড়কের জন্য বনাঞ্চলের জমি কোনোভাবেই বরাদ্দ দেওয়া হবে না। চাইলে আন্ডারপাস বা উড়ালসড়ক করা যায়। কিন্তু বনের ভেতর দিয়ে নতুনভাবে লেন বাড়ানো যাবে না।”

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ধীরগতির চিত্রও হতাশাজনক। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে একনেকে অনুমোদন পাওয়া ‘চট্টগ্রাম–কক্সবাজার হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট–১’-এ চার লেনের বাইপাস, ছয় লেনের ফ্লাইওভারসহ মোট ২৩.৫২ কিলোমিটার উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাইকা দেবে ৫ হাজার কোটি। তবে প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, “মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই টেন্ডার আহ্বান করা হবে”—এটি কার্যত প্রকল্পের ধীরগতিরই প্রমাণ। গত এক বছরে কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি।

সওজ কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, “সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে এটি চার লেন হবে নাকি ছয় লেন—তা নিশ্চিত করে বলা যাবে।”

কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন—মানুষ মরতে মরতে সম্ভাব্যতার কাগজ কি আরও কত বছর ঘুরবে?

পরিবহন ও নগর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা আর সিদ্ধান্তহীনতা যেভাবে প্রকল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে, তা জাতীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কারণ এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ৪০ হাজারের বেশি পর্যটক যাতায়াত করেন। কক্সবাজারের সমুদ্র পর্যটন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য, মহেশখালী বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহন ও রোহিঙ্গা শিবিরের ত্রাণ কার্যক্রম—সবই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল।

ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনেও সম্প্রতি মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনশহরের প্রধান প্রবেশপথ যদি মৃত্যুর সড়ক হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, “এই মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা সময়ের দাবি নয়—এটি জীবনরক্ষার প্রশ্ন।”

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারবাসীর প্রশ্ন আজ তাই অত্যন্ত সরল ও তীক্ষ্ণ—মহাসড়কের উন্নয়ন ফাইল আগে নড়বে, নাকি আবারও লাশ উঠবে এই সড়ক থেকে?

মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে, আর উন্নয়ন এখনো কাগজে বন্দী—এই বাস্তবতার কোনও ব্যাখ্যা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বার্তা বাজার/এমএমএইচ

নিয়োগ চলছে
সংবাদকর্মী আবশ্যক
রেডিও বার্তা টিমে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...
✕
Radio Barta App Screen 1
Radio Barta App Screen 2
রেডিও বার্তার সব নিউজ পেতে ডাউনলোড করুন মোবাইল অ্যাপ
ক্লিক করুন