আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এরই অংশ হিসেবে সোমবার দক্ষিণাঞ্চলের প্রচার শুরু হয় কুষ্টিয়া জেলায় জনসভার মধ্য দিয়ে। জনসভায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আয়না ঘর থেকে মুক্ত হওয়া দাঁড়িপাল্লা এখন মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তারা বলছেন, সব দেখেছেন, এবার দাঁড়িপাল্লা দেখবেন। তাই দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নব্য জালিমরা ভয় পাচ্ছেন। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীদের মর্যাদা, সম্মান রক্ষা করা হবে। বেকার ভাতা নয়, বেকারত্ব দূর করা হবে। নদী বাঁচানো হবে, মিল-কলকারখানা সঠিকভাবে চলবে। অন্য কোনো দেশের অধীনে নয়, বাংলাদেশ নিজের মতো করে স্বয়ংসম্পন্ন হবে। তিনি দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফের প্রতীক উল্লেখ করে ভোট চান।
ডা.শফিকুর রহমান বলেন, উন্নয়নের নামে ৫৪ বছর কমবেশি যারাই ক্ষমতায় গিয়েছেন, তারা সবাই একই কাজ করেছেন। একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। আমারা বিশ্বাস করি এদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্রের পরিবর্তন না করলে ভালো কিছু সম্ভব নয়। মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পরে আমরা অন্যায়ভাবে কারও বিরুদ্ধে একটি মামলাও করিনি। আমাদের দেওয়া আট মামলায় একজন করে আসামি করা হয়েছে, কারণ দ্বিতীয় কোনো দোষী ব্যক্তিকে আমরা খুঁজে পাইনি।
অথচ কেউ কেউ হাজার হাজার মামলা দিয়ে ডায়লগ শুরু করেছে। নাম ঢুকে গেছে, এখন নাম তুলতে হলে মাল-পানি লাগবে, এভাবেই শুরু হয়েছে মামলা বাণিজ্য। একটি দলের বিপক্ষে অভিযোগ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, বিভিন্ন জায়গায় দখলদারি ও চাঁদাবাজিতে নেমে পড়েছে কিছু লোক। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার চালকল ও পণ্যবাহী ট্রাক থেকে অবৈধ খাজনা আদায়ের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চালের ট্রাকপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা নেওয়ার খবর আমরা জানি। বিভিন্ন স্ট্যান্ড দখলের খেলা চলছে। যারা এসব করছেন, ফিরে আসুন। মানুষ আপনাদের ঘৃণা করে, অভিশাপ দেয়।
চাঁদাবাজদের উদ্দেশে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, সত্যিই যদি সংসারের অভাব-অনটনের কারণে এসব করেন, তাহলে সরে আসুন। আল্লাহ আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, তা আমরা আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খেতে রাজি আছি। তবুও মানুষকে কষ্ট দেবেন না, চাঁদাবাজি করবেন না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাঁদাবাজদের বুক থেকে দূরে ঠেলে দেব না, বরং তাদের বুকে টেনে নিয়ে ভালো কোনো কাজে যুক্ত করব।
বক্তব্যের শুরুতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, এ দেশের তরুণরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে পরোয়া করে না। শাসকরা ফাহাদ ও হাদিদের বিদায় করেছে, কিন্তু তাদের রক্তে আজ হাজারো বিপ্লবী তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছর গুমের শিকার পরিবারগুলো সবচেয়ে বড় মজলুম। যে জাতি মায়েদের সম্মান করতে পারে না, তারা বিশ্বব্যাপী অপমানিত হয়। আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে সবার হাতে সম্মানের কাজ তুলে দেওয়া হবে।
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশের সব সেক্টরে পরিবর্তন আসবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের সরকার কুষ্টিয়া চিনিকল পুনরায় চালু করবে। তরুণ প্রজন্ম ও নারীরা আর পুরানো, ‘বস্তাপচা রাজনীতি’ ফেরাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের এত তালা কেনার টাকা নেই যে নারীদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখব। আমরা নারীদের জন্য নিরাপদ সমাজ ও কর্মস্থল নিশ্চিত করব। বড় শহরগুলোতে আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা হবে, যাতে নারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াত ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি থেকে ভিখারি পর্যন্ত সবার জন্য একই বিচার নিশ্চিত করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি। নদী রক্ষার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, পদ্মা-গড়াই এখন আর নদী নয়, মরুভূমি। এই নদী বাঁচানোর টাকা মুখ দিয়ে ঢুকিয়ে পেটে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার সকালে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পাশে শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে আমিরে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভা শুরু হয়। তবে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সমাবেশ স্থলে পৌঁছান বেলা ১২টার দিকে। এসেই তিনি প্রায় ৩০ মিনিট বক্তব্য রাখেন।
এর আগে সকাল থেকে সমাবেশ স্থলে দলে দলে নেতাকর্মীরা এসে অবস্থান নেন। জনসভায় জামায়াতের নারী-পুরুষ নেতাকর্মী ছাড়াও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন থেকে র্যাব, পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
জেলার ভারপ্রাপ্ত আমির কুষ্টিয়া-২ আসনের প্রার্থী আব্দুল গফুর ও কুষ্টিয়া সদর আসনের প্রার্থী ইসলামী বক্তা আমির হামজাসহ চারটি আসনেরই সংসদ সদস্য প্রার্থী মঞ্চে বক্তব্য রাখেন। শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও জোটের নেতারাও বক্তব্য রাখেন।
শেষে চার প্রার্থীকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক উপহার দেন জামায়াত আমির। সেখান থেকে মেহেরপুর জেলার সমাবেশের দিকে রওয়ানা হন জামায়াত আমির।
চুয়াডাঙ্গা ॥ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ২৪-এর বিপ্লব ছিল বুলেটের বিরুদ্ধে, আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব হবে ব্যালটের। চুয়াডাঙ্গায় নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন। সোমবার বিকেল ৫টায় চুয়াডাঙ্গা শহরের টাউন ফুটবল মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উপরোক্ত মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচনে ১১ দলের ২২টি হাত একত্রিত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের আপামর জনগণ একত্রিত হয়েছে। তারা এই বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে চিরতরে লাল কার্ড দেখাবে। গণভোটে হ্যাঁ ভোট জিতলে বাংলাদেশ জিতে যাবে, না ভোট জিতলে বাংলাদেশ হেরে যাবে।
জামায়াতের আমির বলেন, দিশেহারা কেউ কেউ জনগণের ভোটে পরাজিত হওয়ার ভয়ে ১১ দলের পক্ষে যেসব মা-বোনেরা নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে যাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করছেন, অভদ্র আচরণ করছেন। আমাদের নতুন করে সুরসুরি দিয়েন না, আমাদের পরীক্ষা করার কিছুই নেই। জামায়াতের কর্মীরা এক আল্লাহ ছাড়া, হিমালয়ের সামনেও মাথানতো করে না। আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েন না। সুতরাং বেয়াদবি করলে আগুনের ফুলকি দেখানো হবে।
যুব সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকের যুবসমাজ সেই বস্তাপচা রাজনীতি দেখতে চায় না। ৫৪ বছরে যে রাজনীতি বাংলাদেশকে অন্ধকার গলিতে ঢুকিয়ে দিয়েছে, অন্য রাষ্ট্রের তাঁবেদারি করেছে, সেই রাজনীতি আমরাও চাই না। তিনি আরও বলেন, আমাদের যেসব জনপ্রতিনিধি জয়ী হবেন। তারা কখনো সম্পদের পাহাড় বানাবে না। তাদের সম্পদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে না। প্রতিবছরে তাদের এবং স্বজনদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যুব সমাজের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিতে চাই না, সম্মানের কাজ তুলে দিতে চাই। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে যুব সমাজের হাতকে দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়তে চাই।
জেলা জামায়াতের আমির রুহুল আমীনের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ মোবারক হোসাইন , ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ্, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মোল্লা ফারুক এহসান, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃৃবৃন্দ।






