জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আসন সমঝোতায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে জোটভুক্ত দলগুলো। প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে প্রতিটি দলের আসন সংখ্যা। চূড়ান্ত ঘোষণার বিষয়টি আটকে আছে কয়েকটি আসনে। একাধিক শরিক দল একই আসনে অনড় থাকায় চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে কিছুটা সময় লাগছে বলে জানা গেছে। তবে ছোট-খাট এসব সমস্যার সমাধান করে দু-এক দিনের মধ্যেই ৩০০ আসনে জোটের একক প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হবে বলে দাবি করছেন জোটের নেতারা। যদিও চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে শেষ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০টি আসন জোটের একাধিক প্রার্থীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন সমঝোতা নিয়ে সব দলেই কম-বেশি অসন্তোস থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তারা যার যার জায়গা থেকে ছাড় দিয়ে সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চরমোনাইর পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ৩৮ থেকে ৪০টি আসন নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে। তবে তাদের দাবিকৃত তিন থেকে পাঁচটি আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে জামায়াত এবং অন্যান্য শরীক দল। কারণ ওই আসনগুলোয় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রার্থী থাকার পাশাপাশি পাশের নিশ্চয়তা শতভাগ। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আসন সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২৫ থেকে ২৭টি। যদিও ইতোপূর্বে তারা জামায়াতের সঙ্গে ৩০ আসনে সমঝোতা করেছিল।
প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পাচ্ছে ১৫টি আসন। খেলাফত মজলিস ৭টি, এলডিপি ৬টি, এবি পার্টি ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসন পেতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং জাগপা পাচ্ছে একটি করে আসন। জামায়াতের হাতে থাকছে বাকী ১৯০টি আসন। যদিও জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এছাড়া এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শরীক হিসেবে জামায়াত যে অত্যন্ত বিশ্বস্ত তার প্রমান ইতোমধ্যেই দিয়েছে। সমঝোতার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে শরীক দলের শীর্ষ নেতাদের আসন থেকে প্রার্থী সরিয়ে নিয়েছে দলটি। দীর্ঘ দেড় বছর মাঠ চষে বেড়ানো বাঘা বাঘা নেতারা দলীয় হাইকমান্ডের ইশারায় অবলিলায় সরে দাঁড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ থেকে। বিশেষ করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ঢাকা-১১ আসন ছেড়ে দিয়ে মনোনয়নপত্র জমাই দেননি এ আসনে শক্ত অবস্থানে থাকা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট অতিকুর রহমান।
এনসিপির মুখ্য সংগঠন নাসির উদ্দিন পাটোয়ারিকে ঢাকা-৮ ছেড়ে দিয়ে মনোনয়নপত্র জমাদান থেকে বিরত থাকেন দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. হেলাল উদ্দিন। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে রংপুর-৪ ছেড়ে দিয়েছেন জেলা আমির। দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহকে কুমিল্লা-৪ এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠন সার্জিস আলমকে বিনা বাক্য ব্যয়ে পঞ্চগড়-১ আসন ছেড়ে দিয়ে শরীক হিসেবে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা।
একইভাবে ঢাকা-১৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন জোটের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে মাওলানা মামুনুল হককে আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন। জামায়াতের নিশ্চিত আসন ফেনী-২ এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মনজুকে ছেড়ে দিয়েছে অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রার্থী অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বরিশাল-৩ আসন।
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদকে হবিগঞ্জ-২ এবং মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের বাচ্চুকে হবিগঞ্জ-৪ আসন ছেড়ে দিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। এছাড়া এলডিপির সভাপতি কর্ণেল অলি আহমদ, ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল হক, জাগপা প্রধান রাশেদ প্রধান, চেয়ারম্যান এ কেএম আনোয়ারুল ইসলাম, মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম প্রমুখ শীর্ষ নেতার পদ ছেড়ে দিয়েই জোটের আলোচনায় বসছে জামায়াত।
জানা যায়, ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় লিয়াজোঁ কমিটি গতকাল প্রায় চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনার পর আগামীকাল বা পরশু জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর দলীয় প্রধানদের তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত প্রার্থীগণ তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ভোটের আগে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি।
এদিকে কাক্সিক্ষত আসনগুলোয় ছাড় না পেলে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হওয়া আসনগুলোয় প্রার্থী না সরানোর ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। একই ধরণের কথা বলছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কোনো কোনো নেতা। তবে এনসিপির নেতারা এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত উদার বলে জানা গেছে। তাদের ধারণে, প্রথম সারির ১০ থেকে ১২ জনের পর বিজয়ী হয়ে আসার মতো প্রার্থী পাওয়াই কঠিন। এমতাবস্থায় শুধু দরকষাকষি করে আসন আদায় করে নেওয়ার কৌশলের চেয়ে যে আসনে যিনি প্রার্থী হলে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন তাকেই মনোনয়ন দেওয়া উচিৎ। এমন বিবেচনায় এনসিপি শর্তানুযায়ী ৩০ আসনের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানান দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
এদিকে সমঝোতার আলোচনা এখনো জোটগতভাবে চূড়ান্ত হয়নি জানিয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মনজু গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, সুস্পষ্ট কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক আলোচনায় এবি পার্টির সঙ্গে তিনটি আসনে সমঝোতার কথা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি ও অসন্তোষের কথা জানানো হয়েছে। সার্বিকভাবে যে অস্পষ্টতা বিরাজমান, তা আশাব্যঞ্জক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে আটটি দল গত কয়েক মাসে দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। এরপর সেই সমঝোতায় যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। সব মিলিয়ে দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১।






