ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি ও কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার ঘোষণা দিয়ে পরে তা স্থগিত রাখতে বাধ্য হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হুমকি ও কৌশল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করতে বাধ্য হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে তিনি ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনার’ ফল বলে দাবি করলেও ইরান বলছে, এমন কোনও আলোচনাই হয়নি।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত ইরানের পাল্টা হুমকির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। প্রথম প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি আক্রমণ চালায়, তাহলে উপসাগরীয় মিত্রদের টিকিয়ে রাখা লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলো ধ্বংস করা হবে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হবে এবং ইসরায়েলের ওপর আরও জোরালো হামলা চালানো হবে।
তবে পরে জাতিসংঘ সতর্ক করে যে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা যুদ্ধাপরাধ হতে পারে। এরপর ইরান কিছুটা অবস্থান নরম করে। তারা জানায়, তারা মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালাবে। আর ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই মূলত পানি বিশুদ্ধকরণেও ব্যবহৃত হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়, ‘মিথ্যাবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন আমরা পানি সরবরাহে হামলা করব— এটা ঠিক নয়। আমরা প্রতিটি হুমকির জবাব একই মাত্রায় দেব। আপনারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত করলে আমরাও বিদ্যুৎকেন্দ্রেই আঘাত করব।’
অবশ্য হামলায় এই পাঁচ দিনের বিরতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের দুর্বল হয়ে পড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সময় দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কাঠামোকেও সম্ভাব্য বড় আক্রমণের আগে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য কিছুটা সময় দিয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, এটি ট্রাম্পকেও পরিস্থিতি নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা এবং জবাবে তেহরানের পাল্টা হামলা সারা বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে। চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়া ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
এদিকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার মতো কাজ আগে শুরু করে ইসরায়েল। ইউক্রেনে রাশিয়ার কৌশল অনুসরণ করে ইহুদিবাদী এই দেশটি ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়। এই গ্যাসক্ষেত্র কাতারের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়। এতে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যায়। পরে ট্রাম্প ইসরায়েলকে এমন হামলা বন্ধ করতে বলেন।
এই ধরনের হামলাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্লেষণে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভেবেছিল বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসের শিক্ষা তারা উপেক্ষা করেছে। আর তা হচ্ছে— পরাশক্তির হুমকি অনেক সময় বাস্তব প্রয়োগের চেয়েও বেশি কার্যকর।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের উদাহরণ টেনে বলা হয়, রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই আগ্রাসনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট গড়ে ওঠে এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও তাদের মিত্ররা ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে প্রভাব বিস্তার করে।
আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান যুদ্ধ থেকেও শিক্ষা নেয়। আর তা হচ্ছে— দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত হলে পরাশক্তি দেশকেও পরাস্ত করা সম্ভব।
বিশ্লেষণে বারাক ওবামার সময়ের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সিরিয়ার নেতা বাশার আল-আসাদ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে, এমন হুমকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত পদক্ষেপ নেয়নি ওয়াশিংটন। এতে আসাদ ও তার মিত্ররা বুঝে যায়, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কঠোর পদক্ষেপ নেয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ইরানের তেলক্ষেত্র ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দিলে তেহরানও পাল্টা সতর্কবার্তা দেয়। তেহরান বলেছিল, ইরানের উপকূলে হামলা হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথ মাইন পেতে বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। আর এই পদক্ষেপ দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালির মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, এটি এক ধরনের ‘গেরিলা কৌশল’, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পুরোপুরি বিবেচনায় নেয়নি। যদিও এমন সক্ষমতা ইরানের আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইরানের এই হুমকি এক ধরনের পরীক্ষা— যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ঝুঁকি নেবে? এই ঝুঁকি নিলে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও ইউরোপের বড় অংশের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যেও দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। একদিকে তিনি যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত দেন, অন্যদিকে আবার হুমকি দেন। কখনও মিত্রদের কাছে সহায়তা চান, আবার তাদের অপ্রয়োজনীয় বলেও উল্লেখ করেন। এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোও এই পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে। তাদের শহরগুলো গ্যাস-তেল নির্ভর এবং পানির জন্য সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণের ওপর নির্ভর করে। আর এসব স্থাপনা ইরানের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রনীতি শিয়া মতবাদের একটি কঠোর ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সেখানে দেশটিকে একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হবে— এমন বিশ্বাস রয়েছে। এই আদর্শ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান তৈরি হয়েছে।
ইরান নিজেকে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে হুথি, হিজবুল্লাহ, হামাস, আসাদ সরকার এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে তেহরান এই জোটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এমন যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই পিছু হটছেন, সেটিও সম্ভবত উপসাগরীয় মিত্রদের চাপে।
এর মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু ভারতীয় ও পাকিস্তানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির নিহত হওয়া এবং তার উত্তরসূরি মুজতবা খামেনি আহত হতে পারেন— এমন পরিস্থিতিতেও ইরান কৌশলগতভাবে সুযোগ নিচ্ছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
এমন অবস্থায় এখনও ইরানের সরকার ভেঙে পড়ার কোনও লক্ষণ নেই, কিংবা জনগণের কাছ থেকেও বড় ধরনের কোনও বিদ্রোহও দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষণের উপসংহারে বলা হয়, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর শুরু করা এই যুদ্ধের মূল্য আদায় করতে চাইছে ইরান। কিন্তু সেই মূল্য দিতে তাদের মিত্ররাও প্রস্তুত নয়। আর এভাবেই একটি পরাশক্তিকে পরাস্ত করা যায়।






