ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জ এলাকায় ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিলেন এক নারী, যিনি ছিলেন নিহত ব্যক্তির স্ত্রী। পুলিশ জানায়, কনস্টেবল হুমায়ুন কবীরকে (৪৫) পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন তার স্ত্রী সালমা বেগম (৩৫)। এই ঘটনায় তাকে সহ আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেড় মাস ধরে হত্যার ছক তৈরি করেন সালমা। আত্মীয় রাজীব হোসেন ও মরিয়ম বেগম এ পরিকল্পনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। নিহত হুমায়ুনের সঙ্গে পারিবারিক কলহ, বিশেষ করে সালমার রাজীবের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ, হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ঘুমের বড়ি, দা, রশি – পরিকল্পনার ভয়ঙ্কর রূপরেখা
তদন্ত সূত্র জানায়, হত্যার আগে সালমা একটি দা ও একটি রশি সংগ্রহ করেন এবং ঘুমের বড়িও কিনে আনেন। পরে তিনি ফার্মেসি থেকে কেনা ওষুধ গুঁড়ো করে ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে স্বামীকে খাওয়ান। রাতের খাবারের সঙ্গে আঙুর খাওয়ানোর পর হুমায়ুন অচেতন হয়ে পড়েন।
এ সময় চারতলার বাসায় অপেক্ষা করছিলেন তিনজন ভাড়াটে খুনি — ফজলে রাব্বি শুভ (২৩), রাফি খান (১৮) এবং পলি বেগম (৩৫)। রাত আড়াইটার দিকে তারা নিচে এসে ঘুমন্ত হুমায়ুনকে হত্যা করে। সালমা আগে থেকেই তার স্বামীর হাত-পা গামছা দিয়ে বেঁধে রেখেছিলেন।
গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু
ঘটনার বিবরণে উঠে এসেছে, ফজলে রাব্বি ও রাফি গ্লাভস পরে রশি দিয়ে হুমায়ুনের গলায় ফাঁস দেন। হুমায়ুন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান। পরে মরদেহ নিচে নামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় তারা। এরপর পুলিশ খবর পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে।
স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসে বিস্তারিত
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সালমা জানান, স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি এ পথ বেছে নেন। স্বামীর ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে একসময় এক ফকিরের শরণাপন্ন হন, তাকে দশ হাজার টাকাও দেন। কিন্তু ফল না মেলায় খুনের সিদ্ধান্ত নেন।
সালমার দাবি, মরিয়মের পরামর্শে ঘুমের ওষুধ কেনা হয় এবং দেড় মাস আগে তাদের মধ্যে বৈঠকে চূড়ান্ত হয় হত্যার পরিকল্পনা। হত্যাকাণ্ডের পরে ভাড়াটে খুনিদের ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন তিনি, বাকি এক লাখ ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।
পারিবারিক বৈঠকের পর ক্ষোভ
নিহতের ভাই খোকন হাওলাদার জানান, হুমায়ুন তার স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে একবার পারিবারিক বৈঠক আয়োজন করেন। বৈঠকে সালমা সম্পর্ক ছিন্ন করার অঙ্গীকার করলেও, পরে সেই আলোচনা ফাঁস হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। বৈঠকের তিন দিনের মাথায় হুমায়ুন খুন হন।
পুলিশ বলছে, মূল পরিকল্পক এখনো পলাতক
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, এই হত্যা মামলার অন্যতম পরিকল্পক রাজীব হোসেনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাকে ধরতে অভিযান চলছে।
এদিকে নিহত হুমায়ুনের দুই সন্তান বর্তমানে তাদের চাচা খোকনের পটুয়াখালীর বাসায় অবস্থান করছে। খোকনের ভাষায়, “আমার ভাইয়ের সংসার তার স্ত্রীর অপরাধে ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”






