দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার বা থাকার যোগ্য হবেন না বলে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার জেরা অব্যাহত রয়েছে। আজ বুধবার আবারও শেখ হাসিনার আইনজীবী তদন্তকর্মকর্তাকে জেরা করবেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -১-এ এই বিচার চলছে।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের কাছে এ বিষয়ে তিনি বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ হয়েছে। তারা তদন্ত কাজ খুব দ্রুতই সম্পন্ন করবেন। তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে দল হিসেবে বিচারের জন্য আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দল অভিযুক্ত হলে বিচারে কি সাজা হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দলকে তো আর সাজা দেওয়া যাবে না। কি ধরনের সাজা দেওয়া যাবে সেটা আইনে বলা আছে যে, দলকে নিষিদ্ধ করা, সম্পদ জব্দ করা, নেতাকর্মীর বিষয়ে নির্দেশনা ইস্যু করা। এর আগে ৫ অক্টোবর চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন, এনডিএম নামে একটি দল আগেই অভিযোগ দিয়েছিল। আমরা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করছি। সুতরাং বলা যেতে পারে, এই মুহূর্তে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছি। সেটা পুরোদমে শুরু হলে আমরা বলতে পারব, বিষয়টি কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।
প্রজ্ঞাপন জারি ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার বা থাকার যোগ্য হবেন না বলে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়।
সোমবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শাখা এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি নিম্ন লিখিত অবস্থানগুলোতে থাকার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া বা থাকার যোগ্য হবেন না।
স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর সদস্য, কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেয়র বা প্রশাসক হিসেবে নির্বাচিত বা নিয়োগপ্রাপ্ত হতে বা থাকতে পারবেন না। প্রজাতন্ত্রের কোনো চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারবেন না। এ ছাড়া অন্য কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। এতে আরও বলা হয়েছে, উপধারা (১) এ যা কিছুই থাকুক না কেন, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কোনো ব্যক্তি অব্যাহতি বা খালাসপ্রাপ্ত হলে, উক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হবে না।
তদন্ত কর্মকর্তার জেরা অব্যাহত ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আব্দুল্লা আল মামুনের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়বহির্ভূত উল্লেখ করে বিভিন্ন থানায় পুলিশ হত্যার বিষয়ে আসামির আইনজীবীকে জেরা করতে দেয়নি প্রসিকিউশন।
‘দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ এ সাক্ষীকে জেরা করার সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে প্রসিকিউশন তা ট্রাইব্যুনালকে বোঝাতে সক্ষম হয়। পরে এ বিষয়ে জেরা করা হয়নি। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আলমগীরকে জেরার সময় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন বিষয়টি নিয়ে বাধার মুখে পড়েন। পরে তা বাদ দিয়ে অন্য বিষয়গুলোর জেরা হয়। মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনেও শেষ না হওয়ায় বুধবারও জেরা চলবে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ জেরা চলে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত।
লাশগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে ॥ হঠাৎ গুলির শব্দে ভেঙে গেল বিকেলের নিস্তব্ধতা। মুহূর্তেই আতঙ্কে ভারি হয়ে উঠল থানা ভবনের বাতাস। জানালা দিয়ে নিচে তাকাতেই দেখি মানুষজনের চিৎকার আর ছোটাছুটি। অনিরাপদ ভেবে নিজেও নিচে নেমে আসি। ঠিক তখনই একটি ভ্যানে দেখি লাশের স্তূপ। এমন সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কণ্ঠ ভেসে এলো- ‘রাশেদ আপনার হাত খালি আছে, লাশগুলো ঢেকে দেন।’ হৃদয়বিদারক এমনই ঘটনা উঠে এসেছে কনস্টেবল রাশেদুল ইসলামের মুখে।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১২তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। এ মামলায় স্থানীয় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজনই রয়েছেন পলাতক। এদিন বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আদালতকক্ষে আসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিচারিক প্যানেল। এরপর সাক্ষীর ডায়াসে ওঠেন কনস্টেবল রাশেদুল। প্রথমেই দেন নিজের পরিচয়।
জবানবন্দিতে রাশেদুল বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানায় চালক (কনস্টেবল) হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ওই দিন আমার কোনো ডিউটি ছিল না। থানা ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থান করছিলাম। বিকেল চারটা কি সাড়ে চারটায় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। ওই সময় থানা ভবনের জানালা দিয়ে দেখি নিচে লোকজনের হইচই। সেখানে থাকা নিরাপদ না মনে করে নিচে নেমে আসি। তিনি বলেন, নিচে নামার পর থানার মূল ফটকের বাঁ দিকে রাস্তার ওপর একটি ভ্যানে লাশের স্তূপ দেখতে পাই।
আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি সায়েদ স্যার বলেন- রাশেদ আপনার হাত খালি আছে, লাশগুলো ঢেকে দেন। তখন পাশে থাকা নীল রঙের ব্যানার দিয়ে লাশগুলো আমি ঢেকে দেই। ওই সময় ওসি সায়েদ স্যারের সঙ্গে ওসি (তদন্ত ) মাসুদুর রহমান, ওসি (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস, এএসআই বিশ্বজিৎ, কনস্টেবল মুকুল চোকদার, ডিবি ইন্সপেক্টর আরাফাত ছিলেন।
এই সাক্ষী আরও বলেন, লাশগুলো ঢাকার পর থানার পশ্চিম পাশে আটতলা একটি ভবনের নিচে এক ঘণ্টা ধরে অবস্থান নেই। ওই ভবনের নিচতলার একটি ছেলেকে (যার বাড়ি জামালপুর) একটি পাঞ্জাবি ও টুপি দিতে আমি অনুরোধ করি। পরে পাঞ্জাবি ও টুপি পরে কাইচা বাড়ি রোড হয়ে জামগড়া রূপায়নে বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠি। এরপর শুনতে পাই আশুলিয়া থানার ভ্যানভর্তি লাশগুলো পুলিশের গাড়িতে তুলে পুড়িয়ে দিয়েছে। যারা এ কাজ করেছে তারা অমানবিক কাজ করেছে।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন পলাতক আট আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ও গ্রেপ্তার আসামিদের আইনজীবীরা। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ও সাইমুম রেজা তালুকদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, সুলতান মাহমুদসহ অন্যরা।






